বাঙলা কলেজ প্রতিনিধি : দৈনিক৩৬জুলাই
ঢাকা, ৪ অক্টোবর ২০২৫:
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের বোঝা বহন করছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ সামরিক নিপীড়নের ফলে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে আখ্যা দিয়েছিল “textbook example of ethnic cleansing।” বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছে।
মানবতার খাতিরে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও এর মূল্য দেশকে বহন করতে হচ্ছে ভয়াবহভাবে। প্রতি বছর প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে কমতে ৭০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ২৫ শতাংশে। প্রতি মাসে জন্ম নিচ্ছে প্রায় ২ হাজার নবজাতক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরাধ, মাদক ও নিরাপত্তা সংকটের বিস্তার।
জাতিসংঘ মহাসচিবের আশ্বাস
সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফরে এসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন—
রোহিঙ্গাদের খাদ্য রেশন কমানো হবে না,
আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে তিনি সরাসরি কথা বলবেন,
সহায়তা সংকোচনকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন “a crime”,
এবং বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই আশ্বাস কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পথ খুলবে?
তিন দফা দাবি
বাংলাদেশি নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীরা রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানে তিন দফা দাবি তুলেছে—
১) মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
২) জাতিসংঘের প্রতিশ্রুত সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩) রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।
জটিল ত্রিভুজ কূটনীতি
রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হওয়ার পেছনে রয়েছে জটিল আন্তর্জাতিক কূটনীতি।
বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, কিন্তু এখন টিকে থাকার প্রশ্নে কূটনৈতিক লড়াই চালাচ্ছে।
মিয়ানমার সামরিক জান্তার ছত্রছায়ায় সময়ক্ষেপণ করছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিক মানতে নারাজ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নীতিগতভাবে সমর্থন দিলেও কার্যকর পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ব্যবহার করে মিয়ানমারকে রক্ষা করছে। ভারত কৌশলগত কারণে দুই দিকেই খেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মানবাধিকারের কথা বললেও বাস্তবে ভূরাজনীতি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ওআইসি কেবল বক্তব্য দিচ্ছে, বাস্তব পদক্ষেপ সীমিত।
ইতিহাস ও অস্তিত্ব সংকট
রোহিঙ্গারা একসময় আরাকানে জৌলুসপূর্ণ ইতিহাস গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি আলাওয়ালও ছিলেন সেখানকার রাজকবি। অথচ আজ তারা নাগরিক স্বীকৃতি হারিয়ে পরবাসে অনিশ্চিত জীবনে দিন কাটাচ্ছে। ২০১৭ সালের আগস্টে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এত বছর পার হলেও তাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ মানবতার খাতিরে দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য এ বোঝা বহন করা সম্ভব নয়। দেশের ছাত্রসমাজ, ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে বলতে হবে—
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন চাই।
এখনই চাই, আজই চাই, অবিলম্বে চাই।