July 28, 2026, 9:27 pm
শিরোনাম :
‎প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম, ‎বাজারের অস্থিরতায় লাগাম টানতে চাই কার্যকর ‎পদক্ষেপ, পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা, বেড়েছে খুচরা দাম, নাসিরনগরে কাঁচামরিচের কেজি ছাড়ালো ৩০০ টাকা রাজশাহী প্রেসক্লাব সভাপতি সাইদুর রহমানের সুস্থতায় দোয়া মাহফিল সবুজ কুড়িগ্রাম গড়তে সবাইকে অন্তত একটি গাছ লাগাতে হবে’: জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ ‎নাসিরনগরের ধরমন্ডলে জাল টাকার নোট সহ গ্রেপ্তার -১ নাসিরনগর উপজেলা যুব এসোসিয়েশন ঢাকার নতুন কমিটি গঠন, ‎ ‎নাসিরনগরে ১০৭ পিস ইয়াবা সহ এক নারী আটক ‎ স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পর ‘জোরপূর্বক পদত্যাগের’ অভিযোগ! বরইউড়ি মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষকে ঘিরে নতুন বিতর্ক জেলা এনসিপির সংবাদ সম্মেলন আগামীকাল কুড়িগ্রামে আসছেন আখতার, সার্জিস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
নোটিশ :

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট!!

জোনায়েদ হোসেন জুয়েল

দুর্গোৎসবকে ঘিরে ঢাক-ঢোলের তালে মুখরিত পুরান বাজার

 

 

 

মোঃ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি দৈনিক ৩৬জুলাই

 

 

 

বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ঢাক-ঢোলের বাজনার যে গুরুত্ব রয়েছে, তারই এক অনন্য নিদর্শন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগ মুহূর্তে বসে এই হাট, যা পাঁচ শতাব্দী ধরে টিকে আছে এক অমূল্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। পূজার প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানে ঢাকের বাজনা যেন অপরিহার্য অংশ। মহাষষ্ঠী থেকে শুরু করে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত পূজা মণ্ডপে ঢাকের তালে তালে সৃষ্টি হয় অন্যরকম আবহ। ঢাকিরা না থাকলে পূজার আনন্দও যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই প্রয়োজন থেকেই কটিয়াদীতে শুরু হয়েছিল ঢাকের হাট, যা সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেছে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
হাটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বরং বাদকেরা নিজেদের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসেন এবং পূজা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। দলগতভাবে তারা বায়না পান পূজা মণ্ডপে বাজানোর জন্য। দক্ষতা অনুযায়ী তাদের দরদাম ঠিক হয়—কোনো দলের মূল্য ১০-১৫ হাজার টাকা হলেও আবার কারও চুক্তি ৮০ হাজার থেকে লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।
প্রতিবছরের মতো এবারও নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলার শত শত বাদকদল এসে হাজির হয়েছেন কটিয়াদীতে। কারও হাতে ঢাক, কারও হাতে ঢোল, আবার কেউ বাঁশি, সানাই কিংবা মন্দিরা নিয়ে দাঁড়িয়ে বাজিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে তারা নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করেন, আর পূজা উদ্যোক্তারা তা শুনে বায়না ঠিক করেন।
ঈশ্বরগঞ্জের বাবু নিতাই রায় জানান, তিনি প্রতিবছরই এ হাটে আসেন। এবার তিনি পাঁচজন বাদককে ভাড়া করেছেন ৬০ হাজার টাকায়। অন্যদিকে, বিক্রমপুরের পরিমল দেবনাথ জানান, তার পূর্বপুরুষরাও এ হাটে ঢাক নিয়ে আসতেন। এখন তিনি তার ছেলে কমলকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। এ বছর তাদের আটজনের দল নরসিংদীর এক মণ্ডপে বায়না পেয়েছে ৮০ হাজার টাকায়।
ঢাকের হাট শুধু পূজা আয়োজক আর ঢাকিদের জন্যই নয়, এটি এখন সাধারণ মানুষেরও বিনোদনের জায়গা হয়ে উঠেছে। দুই দিনব্যাপী এ হাটে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। কেউ বাদকের বাজনা উপভোগ করেন, কেউবা দরদাম ঠিক করার দৃশ্য দেখতে আসেন। চারদিকে ঢাক-ঢোলের সুরে যেন মেতে ওঠে পুরো এলাকা।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে কটিয়াদীতে প্রথম ঢাকের হাট বসে। দুর্গাপূজার জন্য সেরা ঢাকি খুঁজে আনতেই রাজা এই আয়োজন শুরু করেন। প্রথম দিকে বিক্রমপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে ঢাকিরা নৌপথে এসে অংশ নিতেন। রাজা নিজেই বাজনা শুনে সেরা দল নির্বাচন করতেন। সেই থেকেই শুরু হয় এই ঐতিহ্য, যা এখনও অব্যাহত আছে।
তবে বাদকদের আক্ষেপও রয়েছে। গাজীপুর থেকে আসা ঢাকি কানাই দত্ত বলেন, “আগের মতো আর কদর নেই ঢাকির। এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ভিড়ে ঢাক-ঢোলের ব্যবহার কমে গেছে। সরকার যদি এই ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ নেয়, তবে ঢাকিরা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে৷
ঢাকের হাটের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রী মা সংঘ। তাদের সমন্বয়ক শীতল চন্দ্র সাহা জানান, “এই হাট শুধু বায়না করার জায়গা নয়, বরং এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত ধারক। শত শত বছরের ঐতিহ্যকে আমরা ধরে রেখেছি। এখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এটি টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব।”
ঢাকের হাট এখন শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক। পূজা উদ্যোক্তা, বাদক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে এটি হয়ে ওঠে এক বিশাল উৎসব। ঢাক-ঢোলের বাজনা যখন একসঙ্গে ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আনন্দ যেন একসাথে মিশে গেছে কটিয়াদীর আকাশে-বাতাসে।



আমাদের পেজ লাইক করুন