স্টাফ রিপোর্টার ;
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী মাতামুহুরী, যা পার্বত্য আলীকদম উপজেলার মিয়ানমার সীমান্ত থেকে উৎপন্ন হয়ে আলীকদম, লামা, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার প্রায় ১৫টি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এই নদী শুধু পানিপথ নয়-এটি এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পরিবহন ও জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু গত কয়েক দশকে নদীটির তলদেশ ভরাট, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন, বাঁক পরিবর্তন ও নদীভাঙনের ফলে নাব্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রতি বর্ষায় পানি ধারণক্ষমতা কমে ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনজীবন, কৃষি ও অবকাঠামোতে বিপুল ক্ষতি ডেকে আনছে।
এই প্রেক্ষাপটে মাতামুহুরী নদীকে টিকিয়ে রাখতে বৈজ্ঞানিকভাবে ড্রেজিং ও নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশনের সমাধানঃ
মাতামুহুরী নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার করলে এর প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরে আসবে। বৈজ্ঞানিকভাবে খনন (scientific dreging) করলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি সহজে নিষ্কাশন সম্ভব হবে। ফলে চিরাচরিত বন্যা ও জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে, গ্রামীণ জনপদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাঃ
চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলের কৃষি মূলত নদীর পানি নির্ভর। নদী ভরাটের কারণে জমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, ফলে ধান ও সবজি উৎপাদন ব্যাহত হয়। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক হলে চাষাবাদ সহজ হবে, ফসলের ফলন বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
নদীভাঙন প্রতিরোধ ও অবকাঠামো রক্ষাঃ
প্রতিবছর নদীভাঙনের কারণে শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। পাড় সংরক্ষণ কাঠামো নির্মাণ করলে নদীর তীরবর্তী গ্রাম, সড়ক ও বাজার রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে সেতু ও কালভার্টসহ সরকারি অবকাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হবে- যা উন্নয়ন ব্যয়ও কমাবে।
মিঠা পানির সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানি পুনঃপূরণঃ
নদীর গভীরতা বাড়লে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনঃপূরণ হবে এবং ভবিষ্যৎ পানিসঙ্কট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
নৌপরিবহন ও পর্যটন সম্ভাবনাঃ
নাব্যতা ফিরলে মাতামুহুরী নদী আবারও নৌপরিবহনের উপযোগী হয়ে উঠবে। স্থানীয় জনগণ মালামাল পরিবহনে এই নদীপথ ব্যবহার করতে পারবে। পাশাপাশি পার্বত্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে এই নদীকে ঘিরে ইকো-ট্যুরিজম বা নৌভ্রমণ কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনঃ
মাছ ধরা, নৌযান চালানো, ঘাট ও বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসা— মাতামুহুরী নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবিকা। নদী পুনঃখননের মাধ্যমে মৎস্যসম্পদ ও নদীপথ পুনরুদ্ধার হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে পুনরায় প্রাণবন্ত করবে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণঃ
বর্তমানে নদীর স্থবির পানিতে অক্সিজেনের অভাবে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ সচল হলে জলজ প্রাণীর আবাস পুনরুদ্ধার হবে, নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরবে এবং জলজ ও পার্বত্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে।
দখল ও অনিয়ম রোধঃ
ড্রেজিংয়ের পর নদীর সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা গেলে অবৈধ দখল, স্থায়ী বাঁধ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে। নদী ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং টেকসই পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বঃ
মাতামুহুরী নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি। নদী সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও পর্যটন- সব খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি সরাসরি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-6: Clean Water and Sanitation; SDG-13: Climate Action) বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখবে।
মাতামুহুরী নদী আজ সংকটাপন্ন, কিন্তু এখনও সময় আছে পুনরুজ্জীবনের। সরকারের বৈজ্ঞানিক খনন, পাড় সংরক্ষণ, সীমানা নির্ধারণ ও সম্প্রদায়ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিলে নদীটি আবারও তার জীবনীশক্তি ফিরে পাবে।
এই নদী রক্ষা মানে চকরিয়া-পেকুয়া ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশকে রক্ষা করা।
তাই এখনই প্রয়োজন সরকারিভাবে “মাতামুহুরী নদী পুনরুদ্ধার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প” বাস্তবায়ন-
জনস্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে।