জোনায়েদ হোসেন জুয়েল
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি দৈনিক ৩৬জুলাই
শৃঙ্খলা, মমতা, গবেষণা আর মানবসেবার এক অপূর্ব সম্মিলন
কিশোরগঞ্জের মানুষের কাছে তাঁরা শুধু চিকিৎসক নন, বরং নির্ভরতা, মানবিকতা এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। করিমগঞ্জ উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা এই চিকিৎসক দম্পতি তাঁদের মেধা, নিষ্ঠা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে বদলে দিয়েছেন জেলার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র। যাঁরা একাধারে শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক এবং সমাজসেবক—তাঁরা হয়ে উঠেছেন একটি জেলার মানুষের আস্থা ও আশার বাতিঘর।
মমতাময়ী শিক্ষিকা, কঠোর শৃঙ্খলায় অনড়৷
স্বভাবজাত শৃঙ্খলার প্রতি অটল থেকেও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি যেন এক মাতৃসুলভ আশ্রয়। ক্লাসরুমে তাঁর উপস্থিতিই যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে দায়িত্ববোধ আর আত্মবিশ্বাস। কঠোরতা তাঁর শিক্ষা দর্শনের একটি অংশ হলেও সেই কঠোরতার আড়ালে রয়েছে অদম্য মমতা, গভীর যত্ন আর পথ দেখানোর সাহসিকতা। অনেক শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রা ও ক্যারিয়ার গঠনে তাঁর অবদান অপরিসীম।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় উজ্জ্বল স্বাক্ষর৷
শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে তাঁর গবেষণা কাজ। ইতোমধ্যে দেশি ও বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে ২৮টি গবেষণা প্রবন্ধ। ২০২৪ সালে তিনি ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী সম্মেলন European Society of Clinical Virology-এর আমন্ত্রণে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে রিসোর্স পারসন হিসেবে অংশ নেন, যা বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবজনক মুহূর্ত।
এ সম্মেলনে তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ভাইরোলজিস্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তাঁর কাজ এবং উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়।
করোনাকালে অগ্রভাগে নেতৃত্ব
বিশ্বজুড়ে যখন করোনা মহামারীতে জনজীবন থমকে গিয়েছিল, তখন কিশোরগঞ্জে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন RT-PCR ল্যাবের ফোকাল পারসন হিসেবে। অত্যন্ত সীমিত সময়ে, বিপদসঙ্কুল পরিবেশে, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেন আধুনিক রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাক। তাঁর ঐ সময়ে নেওয়া পদক্ষেপ আজও জেলার স্বাস্থ্য প্রশাসনের এক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
এই ল্যাবের মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত মানুষের নমুনা পরীক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা শুধু জনস্বাস্থ্য সেবায় নয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও বড় ভূমিকা রাখে। তাঁর কৃতজ্ঞ কণ্ঠে জেলার মানুষ বারবার উচ্চারণ করেন—”এই দম্পতির জন্যই আমরা বিপদের দিনে সাহস পেয়েছি।”
চিকিৎসা পেশার বাইরে মানবিক উদ্যোগ৷
চিকিৎসা ও শিক্ষার বাইরে এই দম্পতির মানবিক দিকটিও সমান উজ্জ্বল। সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য নিরবিচারে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। বিশেষ করে এতিম, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছেন একাধিক সহায়ক কার্যক্রম। কখনও অর্থ সহায়তা, কখনও শিক্ষা উপকরণ, আবার কখনও স্বাস্থ্যসেবা—তাঁদের হাত ছুঁয়ে অনেক শিশুর জীবনে এসেছে আলো।
স্থানীয়দের মতে, ‘‘তাঁরা শুধু চিকিৎসক নন, একজন প্রকৃত মানুষ, যাঁরা হৃদয়ে ধারণ করেন সমাজের দায়বদ্ধতা।’’
চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত
তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় কিশোরগঞ্জে গড়ে উঠেছে এক আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো। প্রযুক্তিনির্ভর রোগ নির্ণয়, সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন চিকিৎসা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা তৈরি করেছেন এক স্থায়ী দৃষ্টান্ত। স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার এই প্রচেষ্টা কিশোরগঞ্জ জেলার চিকিৎসা খাতে এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
এই দম্পতির হাত ধরেই অনেক তরুণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী অনুপ্রাণিত হচ্ছেন, শিখছেন—কীভাবে একজন পেশাজীবী হয়ে ওঠেন একজন মানবিক পথপ্রদর্শক।
তাঁরা কেবল একজন চিকিৎসক দম্পতি নন—তাঁরা হয়ে উঠেছেন এই সময়ের সমাজনায়ক। যাঁদের জীবনভর সংগ্রাম, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে পুরো দেশ। কিশোরগঞ্জ আজ গর্বিত তাঁদের নিয়ে। তাঁরা প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন দেখলে শুধু নিজে নয়, একটি সমাজ বদলানো সম্ভব। এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবচেয়ে প্রয়োজন—একটি দায়বদ্ধ হৃদয়।