জোনায়েদ হোসেন জুয়েল
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি দৈনিক৩৬জুলাই
শনিবার ৬-৯-২৫ইং তারিখে সারাদেশ যখন পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনে মুখর, তখন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিল নীরবতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এই বিদ্যালয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। বরং দিনটিতে স্কুল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুবকর ছিদ্দিক। তার এমন একতরফা সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকরা তার পদত্যাগ ও বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন।
সরকারি নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশের সকল মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিলাদ মাহফিল, হামদ-নাত, গজল, এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আদর্শ নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করতে হবে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে এই নির্দেশনা দেশের সকল প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে প্রেরণ করা হয়। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সব কর্মসূচি ধর্মীয় মর্যাদা বজায় রেখে সুষ্ঠুভাবে পালন নিশ্চিত করতে হবে।
আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিল না কোনো আয়োজন
তবে এই নির্দেশনার ছিটেফোঁটাও মানেননি আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুবকর ছিদ্দিক। ঈদের দিন অর্থাৎ ৬ সেপ্টেম্বর শনিবার বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হয়। কোথাও কোনো আয়োজন, আলোচনা, বা মিলাদ মাহফিল হয়নি। ধর্মীয় অনুভূতির এমন উপেক্ষা ও সরকারি নির্দেশনার এমন উদাসীনতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীদের অভিযোগ, “এই দিনটি আমাদের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার অন্যতম একটি সুযোগ ছিল। অথচ প্রধান শিক্ষকের অবহেলায় তা নষ্ট হয়ে গেল। এমন আচরণ একজন শিক্ষক থেকে কাম্য নয়।”
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আগেও ছিল অভিযোগ
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক আবুবকর ছিদ্দিক এর আগেও একাধিকবার সরকারি চিঠিপত্র ও নির্দেশনা অমান্য করেছেন। বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতেও তিনি নিজ উদ্যোগে কোনো আয়োজন করতে অনাগ্রহী। অনেক সময় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে অন্ধকারে রেখেই একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন স্থানীয় মসজিদের ইমাম বলেন, “ঈদে মিলাদুন্নবী শুধু ছুটির দিন নয়; এটি আমাদের নবী (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও মানবতার শিক্ষা গ্রহণের দিন। প্রধান শিক্ষক একজন আদর্শবান মানুষ না হলে শিক্ষার্থীরা কোথা থেকে আদর্শ শিখবে?”
অভিযোগ পেলে তদন্ত হবে: শিক্ষা অফিস
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, “সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে যদি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি পালন না করে, তাহলে সেটি অবশ্যই প্রশাসনিক দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পদত্যাগ দাবি স্থানীয়দের
এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রধান শিক্ষকের অপসারণ ও বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এলাকাবাসী জানান, “প্রধান শিক্ষক যেভাবে সরকারি নির্দেশনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন, তাতে তার দায়িত্বে থাকার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।”
তারা আরও বলেন, “আমরা চাই, একজন দায়িত্বশীল ও ধর্মানুরাগী শিক্ষক এই বিদ্যালয়ের দায়িত্বে আসুন, যিনি আমাদের সন্তানদের ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা দিতে পারবেন।”
শিক্ষকের দায়িত্বে অবহেলা কি বরদাস্তযোগ্য?
একজন প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক প্রধান নন, তিনিই শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক আদর্শে গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেন। অথচ আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুবকর ছিদ্দিকের এমন দায়িত্বহীন আচরণ প্রশ্ন তোলে তার অবস্থানের যথার্থতা নিয়ে।
সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞা এবং ছাত্র-অভিভাবকদের প্রত্যাশার প্রতি চরম অসম্মান – এই সবকিছুই ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি তদন্তযোগ্য এবং ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন এই ঘটনায় কী পদক্ষেপ নেয়।