কাশেম হাওলাদার, বরগুনা: প্রতিনিধি
দৈনিক৩৬জুলাই
ট্রি-হসপিটাল ভাগ্য বিড়ম্বিত এবং আহত গাছের একটি আশ্রয়কেন্দ্র। বরগুনার বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান সুরঞ্জনা ইকো টুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট-এর একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এটি। দেশজ বৃক্ষ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এটি বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র উদ্যোগ, যা ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন ভাবনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।
বরগুনার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মনিজা বলেন, “শহরে বাড়ির জমি বিক্রি করে নতুন ভবন নির্মাণের কারণে আমাদের বাবা-মায়ের হাতে লাগানো বহু স্মৃতিবিজড়িত বৃক্ষ কেটে ফেলার প্রয়োজন পড়ে। অথচ ওইসব গাছকে ঘিরেই রয়েছে আমাদের ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি—আমাদের বাপ-দাদার সময়ের গল্প। এমন পরিস্থিতিতে সুরঞ্জনা ইকো টুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট সমস্যাটির কার্যকর সমাধান দিয়েছে। তারা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে সেসব গাছ তুলে নিয়ে তাদের ‘ট্রি-হসপিটালে’ সংরক্ষণ করেছে। এখন সেখানে বেড়াতে গেলে নিয়মিত সেসব গাছের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, কথা হয় স্মৃতির।”
অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ রোখসানা বেন্জু বলেন, “স্থান স্বল্পতার কারণে আমাদের বাড়ি থেকেও কিছু গাছ তুলে নিয়ে সুরঞ্জনায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রায়শই সুরঞ্জনায় বেড়াতে গিয়ে সেসব গাছের সঙ্গে দেখা হয়। এতে আমাদের এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি ও ভালো লাগা কাজ করে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়।”
স্থানীয় বৃক্ষপ্রেমী, পরিবেশ কর্মী এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কর্মীরাও এ উদ্যোগকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বৃক্ষ ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সুরঞ্জনার পক্ষ থেকে বন বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে, যাতে ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো গাছ না কাটার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সুরঞ্জনা ইকো টুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট-এর উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজ বলেন, “উপকূলীয় জেলা বরগুনা একদিকে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ, অন্যদিকে নদীভাঙনের শিকার। প্রতিবছর শত শত বৃক্ষ ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। এছাড়াও নগর উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, জমি বিক্রি বা ভবন নির্মাণের কারণে বহু বছর ধরে বেড়ে ওঠা স্মৃতিবিজড়িত বৃক্ষ কেটে ফেলতে হয়। এই পরিস্থিতিতে আমরা গাছগুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে তুলে এনে সুরঞ্জনায় রোপণ করি। বর্তমানে প্রায় দুই শতাধিক এমন ‘ভাগ্যবিড়ম্বিত’ বৃক্ষ রয়েছে আমাদের ট্রি-হসপিটালে।”
“এসব গাছ সংরক্ষণে সরকারি কোনো প্রকল্প নেই। অথচ এ গাছগুলো সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের প্রাঙ্গণে কিংবা বৃক্ষশূন্য সড়কে রোপণ করলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পেত, পাশাপাশি বাড়তো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও।”
“যেমন ১৮ বছর না হলে একজন কন্যা সন্তানকে বিয়ে দেওয়া যায় না, ঠিক তেমনি ১৮ বছর বয়স না হলে কারও লাগানো কোনো কাঠ বা ফলদ বৃক্ষ কাটা যাবে না এমন একটি আইন হওয়া জরুরি। এতে পরিবেশ যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি বৃক্ষ মালিকরাও লাভবান হবেন।”
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার’ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আলমগীর কবীর বলেন, “বরগুনার সুরঞ্জনার ট্রি-হসপিটাল সম্পর্কে আমি অবগত। পৃথিবীর অনেক দেশে বহুবর্ষজীবী বৃক্ষ সংরক্ষণ এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ও নদীভাঙন কবলিত অঞ্চলে গাছ সংরক্ষণের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম ও কার্যকর। প্রতিটি জেলায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ থাকা উচিত।”
বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, “সুরঞ্জনার ট্রি হসপিটাল আমি পরিদর্শন করেছি। নিঃসন্দেহে এটি একটি অনন্য উদ্যোগ। এখানে তাল, খেজুর, গাব, কাঠবাদাম, ডেউয়া, কাউফলসহ বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির সহস্রাধিক বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ছাড়াও পাখিদের জন্য একটি অভয়াশ্রম সৃষ্টি করেছে। দেশের অন্যান্য ইকো রিসোর্টের জন্য সুরঞ্জনার এ উদ্যোগ অবশ্যই অনুসরণযোগ্য।”
www.daynik36july.com