পাটগ্রাম, লালমনিরহাট | ৭ জুন ২০২৫ | সকাল ৯টা
ঈদের দিনে যেখানে চারদিকে উৎসব আর আনন্দের ছোঁয়া—সেই সকালটা এক তরুণীর জন্য হয়ে উঠল বিভীষিকাময়, মৃত্যু অনিবার্য রূপ নিল। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার কুচলিবাড়ি ইউনিয়নের মেম্বারপাড়া গ্রামে স্বামীর হাতে গলাকাটা অবস্থায় নির্মমভাবে নিহত হন এমি আক্তার (৩৫)।
ঈদের সকালে যখন বাড়ির সবাই ঈদের নামাজে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে হাজির হন এমির স্বামী হাফেজ হাসিবুল ইসলাম, পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক। ছয় মাস আগে দাম্পত্য কলহে স্ত্রীকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এমি ভেবেছিল—আজ ঈদের দিন, হয়তো স্বামী তাকে নিতে এসেছে, বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে সংসারটা আবার জোড়া লাগবে।
এমন আশায় সে স্বামীর পছন্দের খাবার তৈরি করতে আগ্রহী হয়, তাকে বারবার নামাজে যাওয়ার তাগাদা দেয়। কিন্তু হাসিবুল বারবার বলে “আসছি”, অথচ উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন।
ঈদের জামাতে না গিয়ে হাসিবুল স্ত্রীকে নিয়ে পূর্বের সব কলহর কথা তোলে। এমি হতভম্ব হয়—একটা পবিত্র দিনে হঠাৎ পুরনো অভিযোগ কেন?
কথা থেকে কথা গড়ায় তর্কে। এমির চোখে তখনও ছিল আশার আলো—তবু সে অনুরোধ করে, “ঈদের দিন ঝগড়া নয়, নামাজ পড়ে খেতে বসো।” কিন্তু হাসিবুল চেয়েছিল ঝগড়ারই অজুহাত, যেন মনের ভেতরের অন্ধকার রূপ পায় অমোঘ পরিণতি।
একপর্যায়ে তর্ক গড়ায় ধ্বস্তাধস্তিতে। পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে লুকিয়ে আনা ধারালো ছুরি বের করে স্ত্রীর পিঠে প্রথম কোপ মারেন হাসিবুল। এরপর মুখ চেপে ধরে স্ত্রীকে মাটিতে ফেলে দিয়ে গলায় ছুরি চালান, যেন পশু জবাই করা হচ্ছে। এমি চিৎকার করলেও আশপাশের কেউ এসে উঠতে পারেনি—সবাই তখন ঈদের নামাজে।
রক্তে ভিজে যায় ঘরের মাটি। একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে অসহায় এমি আক্তার।
চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন দৌড়ে এসে দেখে, এমির গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, দেহ নিথর। পাশেই পড়ে থাকা ছুরি আর উল্টো দিকে খোলা দরজা—যেখানে দিয়ে স্বামী হাসিবুল পালিয়ে যায়।
ঘটনার খবর পেয়ে পাটগ্রাম থানার পুলিশ এসে আলামত সংগ্রহ করে, কিন্তু হত্যাকারীকে খুঁজে না পেয়ে তার বাবা ও ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে।
প্রতিবেশীদের মতে, এই দম্পতির মধ্যে আগেও কলহ লেগে থাকত। কিন্তু এমন একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড—তা কল্পনাতেও আনেননি কেউ। এমি বারবার চেষ্টা করেছেন সংসার টিকিয়ে রাখতে। স্বামী মারলেও, মানসিক নির্যাতন করলেও—সে ধরেছিল সংসারটা একদিন ঠিক হবে।
একজন নারী বাবার বাড়ি আশ্রয় নিলেও, মনে মনে চায়—স্বামী ফিরুক, বাচ্চার মুখে ঈদের সেমাই উঠুক। সেই স্বপ্নটাই ঈদের সকালে গলায় ছুরির কোপে শেষ হয়ে গেল। তার ছোট সন্তানটি আজ বাবা-মা দুজনকেই হারাল—একজন মৃত্যুতে, আরেকজন নরপশুত্বে।
স্বামী মানে ভরসার শেষ আশ্রয়। কিন্তু এই সমাজে যখন সেই আশ্রয়টাই পরিণত হয় মৃত্যুর যন্ত্রে, তখন প্রশ্ন উঠে—নারীর নিরাপত্তা কোথায়? ঈদের সকালে যখন রাস্তায় কোরবানির রক্ত বয়ে চলেছে, তখন এক নারীর গলা দিয়ে বের হওয়া রক্ত সমাজের কুশিক্ষা আর সহিংসতার নিদর্শন হয়ে রয়ে গেল।
এই হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি।
✍️ সংবাদ প্রতিনিধি
www.daynik36july.com