জোনায়েদ হোসেন জুয়েল
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি :দৈনিক৩৬জুলাই
হাওরের টানে, প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে এসেছিলেন বনান্ত ইসলাম। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রাই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ ভ্রমণ। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচরের করচবন হাওরে গোসলে নেমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন মাত্র ২২ বছর বয়সী এই তরুণ।
ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (৯ জুলাই) দুপুরে। বনান্ত ইসলাম বগুড়া জেলার কান্দারবাজার এলাকার বাসিন্দা ও সৈয়দ আহম্মেদ কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
বন্ধুরা জানালেন হৃদয়বিদারক সেই মুহূর্তের কথা
পরিবারের বরাতে জানা যায়, বনান্ত বন্ধুদের নিয়ে কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত পাগলা মসজিদ ঘুরে দেখেন। এরপর আনন্দভ্রমণের অংশ হিসেবে তাঁরা নিকলীর ছাতিরচর হাওরে আসেন। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় করচবন হাওরে দুপুরের রোদে পানিতে নেমে সাঁতার কাটছিলেন সবাই। হঠাৎ করেই বনান্ত গভীর পানিতে তলিয়ে যান।
সাথের বন্ধু মো. সিয়াম বলেন, “আমরা কয়েকজন একসঙ্গে নামি। বনান্ত হঠাৎ কীভাবে যেন হারিয়ে যায়। ওকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমরা চিৎকার শুরু করি। এরপর আশপাশের মাঝিরা এসে পানিতে খোঁজ নিয়ে ওকে টেনে তোলে। কিন্তু তখনই আমরা বুঝতে পারি, সব শেষ।”
হাসপাতালে নেওয়া হলেও রক্ষা হয়নি প্রাণ
তাঁকে দ্রুত নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক বনান্তকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন বলেন, “মরদেহ থানায় রাখা হয়েছে। নিহতের পরিবার ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিতে চাচ্ছেন। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”
হাওরে পর্যটন বাড়লেও নিরাপত্তা অনুপস্থিত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নিকলীর হাওর এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেট, সাঁতার জানার বাধ্যবাধকতা বা গাইড না থাকায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বনান্ত ইসলামের এই মৃত্যু শুধুই একটি ঘটনা নয়—এটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো আমাদের অব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাব।
স্থানীয়দের আহ্বান
স্থানীয় এক মাঝি বলেন, “অনেক সময় বাইরের লোকজন হাওরের গভীরতা বুঝতে পারেন না। আবার সাঁতার জানলেও হঠাৎ স্রোত বা পাঁকে আটকে বিপদ হতে পারে। এ জন্য পর্যটকদের সচেতনতা দরকার, আর প্রশাসনেরও নিরাপত্তা বাড়ানো উচিত।”
পরিবারে শোকের ছায়া
একটি সম্ভাবনাময় তরুণের এমন করুণ মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বন্ধুরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, বনান্ত আর নেই।
হাওরের সৌন্দর্য আমাদের সবার, কিন্তু সে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গেলে প্রয়োজন সচেতনতা, প্রস্তুতি, এবং নিরাপত্তা। বনান্ত ইসলামের মৃত্যু যেন আমাদের চোখ খুলে দেয়। যেন আমরা শিখি, এবং আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে না বেড়াতে হয়।