🖊 মোঃ সাইফুল ইসলাম
নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
৫ জুলাই ২০২৫, শনিবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের কাঠালকান্দি গ্রাম যেন এক আগুনে ঝলসানো যুদ্ধক্ষেত্র। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২৫ বছর বয়সী ছাত্রদল নেতা সোহরাবের খুনের ঘটনায় গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা। পরিণতিতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে শতাধিক পরিবার, পুড়েছে পাঁচটি বাড়ি, লুটপাট হয়েছে প্রায় তিন ডজন ঘরবাড়ি ও অর্ধডজন দোকান। আতঙ্কে বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনশূন্য হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য।
চাতলপাড় বাজারে ৫ জুলাই শনিবার মোল্লা গোষ্ঠী ও উল্টা গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সোহরাব নিহত হন। এরপর বিকেল থেকে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মধ্যযুগীয় উন্মত্ততা।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে পোড়া টিন, ভাঙা জানালা-দরজা, এসি, ফ্রিজ, আসবাবপত্র ছড়িয়ে আছে রাস্তায়। কিছু ঘর থেকে এখনো বের হচ্ছে ধোঁয়ার গন্ধ। স্থানীয় বৃদ্ধা মমতাজ বেগম বলেন, “আমরা নিরপেক্ষ থাকলেও মোল্লা গোষ্ঠীর হামলায় সব হারিয়েছি।” এক নারী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার স্বর্ণালঙ্কার, ওষুধ, এমনকি পানির টিউবওয়েলটাও নিয়ে গেছে।”
কাঠালকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেক শিক্ষার্থী স্কুলে অনুপস্থিত। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ২১ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। একজন শিক্ষক আতঙ্কে ছুটি নিয়ে আত্মগোপনে আছেন বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক তুহিনা বেগম।
বাজারের অন্তত ছয়টি দোকান লুটপাটের শিকার—চাল আড়ত, মোবাইল-রিচার্জ, রড-সিমেন্ট দোকানসহ। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী হামজা জানান, “২৫ লাখ টাকা ও দোকানের সব মাল লুটে নিয়েছে।”
বিএনপি নেতা মোল্লা গোষ্ঠীর মোতাহার মিয়া এবং যুবদল নেতা গিয়াস উদ্দিনের উল্টা গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই এই সহিংসতার মূল। গিয়াস উদ্দিনের অভিযোগ—তাদের পাঁচটি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ৪০টিরও বেশি ঘরে চালানো হয়েছে লুটপাট।
চাতলপাড় তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “জনবল সংকট ও যানবাহন না থাকায় সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। শত শত লোক টেঁটা-বল্লম নিয়ে হামলায় অংশ নেয়।”
অবাক করা বিষয়, এত বড় সহিংসতার পরও এখনো কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ জানায়, “মামলা প্রক্রিয়াধীন, নিরপরাধদের আসামি করা না হয় সে বিষয়ে যাচাই চলছে।”
ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, “দুই বড় গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বে তৃতীয় পক্ষ কিছু করতে পারেনি। আমি অনুতপ্ত।”
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইসহাক মিয়া জানান, “দ্রুত নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নাসিরনগর থানার ওসি আজহারুল ইসলাম বলেন, “এলাকা এখন শান্ত, তদন্ত চলছে।”
www.daynik36july.com
🕊️এই ঘটনায় মানবিক সহায়তা ও দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।